ঘুমের ঘোরে শরীর ঝাঁকি দেওয়া - হিপনিক জার্ক

ঘুমের ঘোরে শরীর ঝাঁকি দেওয়া - হিপনিক জার্ক

আমরা বোধ হয় সকলেই এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি, তা হলো ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কোথা থেকে যেনো পড়ে যাচ্ছি এমন মনে হওয়া বা হঠাৎ শরীরে একটা ঝাঁকি অনুভব করা অনিচ্ছাকৃত ভাবেই। এই বিষয়টাকে অনেক নামেই ডাকা হয়ে থাকে, সবথেকে পরিচিত নাম হচ্ছে হিপনিক জার্ক, আরো কিছু নামে ডাকা হয়ে থাকে যেমন স্লিপ স্টার্ট, স্লিপ টুইচ, মায়োক্লনিক জার্ক, নাইট স্টার্ট ইত্যাদি। আমাদের শরীরে ঘটা একটা ঘটনার নাম ইনভলেন্টিয়ারি মাসল মুভমেন্ট বা অনৈচ্ছিক পেশি সঞ্চালন যার এক প্রকারের নাম মায়োক্লনাস। হেচঁকি বিষয়টার সাথে তো আমরা সকলেই পরিচিত, হেঁচকি এই পেশি সঞ্চালন বিষয়টা মায়োক্লনাসের একটা উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। হিপনিক জার্কও মায়োক্লনাসের আরেকটা উদাহরণ, শুধু পার্থক্য হচ্ছে হেচঁকি ওঠে জাগ্রত অবস্থায় আর হিপনিক জার্ক ঘটে ঘুমের মধ্যে। দুটোই আসলে অনৈচ্ছিক পেশি সঞ্চালন ছাড়া কিছুই নয়। হিপনিক জার্ক মূলত ঘটে থাকে Non-REM স্লিপ মোডে, অর্থাৎ একদম গভীর ঘুমে (REM Sleep Mode) যাওয়ার আগ মুহুর্তে। এই হিপনিক জার্কে কী কী ঘটে থাকে তা নিয়ে আরো একটু কথা বলা যাক।

হিপনিক জার্ক সাধারণত দুইরকম হয়ে থাকে। প্রথম ধরণ হচ্ছে তীব্র, দ্বিতীয় ধরণ হচ্ছে হালকা। হালকা হিপনিক জার্কে শরীর হঠাৎ ঝাঁকি দিয়ে ওঠে ঠিকই তবে ঘুমন্ত ব্যক্তি তা টের পায়না, ঘুম থেকে উঠেও যায়না। তবে তার আশেপাশে কেউ থাকলে বিষয়টা সে টের পায়। চোখে পড়ার মতোই ঘুমন্ত ব্যক্তির শরীর কেঁপে ওঠে। অন্যদিকে তীব্র হিপনিক জার্কে ঘুমন্ত ব্যক্তি খুব ভালোভাবেই জেগে যায়। সাধারণত ওই ব্যক্তি ঘুমের ভিতর অস্পষ্ট স্বপ্ন দেখে যেখানে সে কোনো উঁচু ভবন থেকে পড়ে যাচ্ছে, কিংবা হঠাৎ কোনো এক গভীর তলহীন গর্তে অনবরত ভাবে পড়তেই আছে। এই স্বপ্নের জন্য ঘুমন্ত ব্যক্তি ভয়ে বা আকষ্মিকতায় জেগে ওঠে। অন্যদিকে কেউ কেউ এইসব স্বপ্ন নাও দেখতে পারে, শুধু হঠাৎ একটা ঝাঁকি অনুভব করতে পারে যা তার জেগে যাওয়ার কারণ হয়। অন্য একটা ঘটনাও ঘটে থাকে যা একটু বিরল, তা হচ্ছে ইলেক্ট্রিক শকের অনুভূতি পেয়ে জেগে যাওয়া। এই সকল ঘটনাগুলোই ঘুমন্ত অবস্থায় হয়ে থাকে বা হালকা ঘুমে হয় যাকে আমরা তন্দ্রা বলি। এই অনুভূতি সাধারণত প্রত্যেকবার ঘুমের সময় হয় না, হঠাৎ হঠাৎ কোনো একদিন হতে পারে। প্রায় ৭০% মানুষ জীবনে একবার হলেও এই ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে। এখন যেহেতু জানা গেলো হিপনিক জার্ক কী, এটা কেন ঘটে তা জেনে নেওয়া যাক।

হিপনিক জার্ক যে ঠিক কোন কারণে ঘটে তা এখনো সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। কিছু সম্ভাব্য কারণ অবশ্য খুঁজে পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ হচ্ছে-

প্রচুর ক্লান্তি: ঘুমের আগে প্রচন্ড ক্লান্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলে এমনটা হতে পারে। ঘুমানোর আগে নিজেকে একটু রিল্যাক্স করে নিয়ে ঘুমাতে গেলে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। ক্লান্তির জন্য খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়ার ফলে শরীরের মাসল গুলো অতি দ্রুত রিল্যাক্স হতে থাকে, ফলে মস্তিষ্ক বিভ্রান্তিকর তথ্য পায় যে শরীর হয়তো কোনো কারণে অবশ হয়ে গেছে এবং নিচে পড়ে যাচ্ছে যা অবশ্যই ওই ব্যক্তির জন্য হুমকিস্বরূপ, ফলে অনৈচ্ছিক পেশি সঞ্চালনের সাহায্যে জাগিয়ে তোলা হয় নিজেকে সামলানোর জন্য।

ঘুমানোর ভঙ্গি: ভুল ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে পড়লে হাত পায়ের পেশিতে ব্যথা হতে পারে বা রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এই সময় হিপনিক জার্ক ঘটতে পারে।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা নিকোটিন গ্রহণ: ঘুমের আগে প্রচুর ক্যাফেইন পান করলে বা নিকোটিন গ্রহণ করলে হিপনিক জার্ক বারবার ঘটতে পারে। ক্যাফেইন আসলে মস্তিষ্ককে সতর্ক রাখতে সাহায্য করে। মস্তিষ্ক যত বেশি সতর্ক থাকে, ঘুমের সময় খুব অল্প নড়াচড়াতে হিপনিক জার্ক ঘটার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়। ঘুমের সময় যদি মস্তিষ্ক নিজেই রিল্যাক্স না হতে পারে তাহলে ঘুমাবেটা কে?

অতিরিক্ত দুঃশ্চিন্তা: দুঃশ্চিন্তা থাকা অবস্থায় বা স্ট্রেসফুল অবস্থায় ব্যক্তি ঘুমাতে গেলে ক্যাফেইন গ্রহণের মতোই মস্তিষ্ক খুব সতর্ক থাকে। ফলে সামান্য মাসল টুইচিং ঘটলেও ঘুমন্ত ব্যক্তি জেগে যেতে পারে।

হিপনিক জার্ক ঠিক কেন ঘটে তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া না গেলেও কিছু হাইপোথিসিস ঠিকই আছে। যেমন ঘুমের সময় মাসল রিল্যাক্সেশন এবং ব্লাড প্রেশার কমে যাওয়ার সময় শরীরের স্বাভাবিক একটা রিফ্লেক্স হিসেবে কাজ করে হিপনিক জার্ক। এছাড়া আরো একটা মজার হাইপোথিসিস হচ্ছে, মস্তিষ্ক এখনো প্রাচীন কালের বিষয়গুলো ভাবে। অর্থাৎ মানুষ গাছে ঘুমানোর সময় হয়তো গাছ থেকে হঠাৎ পড়ে যেতে পারে, বেশি নড়াচড়া করলে সেসময় মস্তিষ্ক জোর করে নিজেকে জাগিয়ে তুলতো গাছ থেকে পড়ে আঘাত পাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে। এই ব্যাপারটা এখনো আমরা অনুভব করি। অবশ্য এসবই হাইপোথিসিস ছাড়া কিছুই না, পর্যাপ্ত প্রমাণ কোনোটার পক্ষেই পাওয়া যায়নি।

হিপনিক জার্ক সম্পর্কে তো সবই জানা গেলো, এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটা কি ক্ষতিকর কিছু? সহজ উত্তর হচ্ছে, না, হিপনিক জার্ক ক্ষতিকর কিছু না, এর জন্য ভয় পেয়ে ডাক্তার দেখানোরও তেমন প্রয়োজন নেই। হঠাৎ হঠাৎ কারোর সাথে এই ব্যাপারটা ঘটে, সে ঘুম থেকে জেগে যায় আবার ঘুমিয়েও যায় এবং দ্বিতীয়বার এটা আর ঘটেনা। অনেক সময় ঘুম থেকে উঠলে দেখা যায় উচ্চতার ভয়ে বা আকষ্মিকভাবে পড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখার দরুন শরীর প্রচন্ড ঘামছে, গলা শুকিয়ে আসছে, হার্টবিট বেড়ে গেছে এসব। তবে একটু সময় দিলে এগুলো ঠিক হয়ে যায়। ব্যাপারটা অনেকে আবার উপভোগও করে যেহেতু উঁচু কোথাও থেকে পড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পাওয়া মুশকিল।

এটা ছিলো সহজ উত্তর। কিন্তু সমস্যা একেবারে নেই বললেও ভুল হবে৷ অনেকের এই সমস্যাটা একটু বেশিই ঘটে। রাতে ঘুমানোর সময় বারবার হিপনিক জার্ক ঘটতেই থাকে যা ওই ব্যক্তিকে গভীর ঘুমের স্টেজে যেতেই দেয়না। ফলে অনিদ্রা দেখা দিতে পারে যা অবশ্যই অত্যন্ত বিরক্তিকর। বারবার ঘুমাতে গিয়ে বারবার উঠে যাওয়া ঘুম পর্যাপ্ত না হয়েই, ব্যাপারটা অবশ্যই কষ্টকর এবং বিরক্তিকর। ফলে অনেকে একটা ভয়ের মধ্যে থেকে স্ট্রেসফুল অবস্থানে চলে যায়, সে ভাবে যে আজ রাতেও হয়তো এমনটা হবে ফলে সে আর ঘুমাতেই পারে৷ এমনটা ঘটলে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে, হয়তো মেডিসিন সাজেস্ট করবে বিশেষজ্ঞগণ। এছাড়া উপরোক্ত কারণগুলো লক্ষ্য করে সেগুলো থেকেও হিপনিক জার্ক কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যায়। যেমন ঘুমের আগে বেশি ক্যাফেইন বা নিকোটিন গ্রহণ না করা, অতিরিক্ত ক্লান্তি নিয়ে ঘুমাতে না যাওয়া, ঘুমের একটা নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করা ইত্যাদি। এছাড়া ঘুমের সময় বাতি জ্বালিয়ে রাখলে মস্তিষ্ক সতর্ক থাকতে পারে, তাই ঘুমের আগে কোনোরকম ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের সংস্পর্শে না যাওয়া এবং বাতি নিভিয়ে রাখা হিপনিক জার্কের সম্ভাবনা কমাতে পারে।

এই ছিলো হিপনিক জার্কের নাড়ী-নক্ষত্র। বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবে নিলে দৈনন্দিন জীবন-যাপনে খুব বেশি সমস্যা হবেনা। তবে যদি নিজের কাছেই মনে হয় যে এই সমস্যার জন্য ঘুমাতে পারছিনা তবে চিকিৎসা নিতে দেরি করা যাবেনা।

Post a Comment

Previous Post Next Post