জ্বিন ও জ্বিনের প্রকারভেদ

জ্বিন ও জ্বিনের প্রকারভেদ

জ্বিন হলো এমন একটি অদৃশ্য স্বত্তা, যা মানুষের চোখে দেখা যায় না। কোরআন ও হাদিসে জ্বিনের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ আছে। প্রশ্ন হচ্ছে কি কি ধরণের জ্বিন আছে? মানুষেরা যেমন বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত একইভাবে জ্বিনরা নানান শ্রেণিতে বিভক্ত।

১. হিন 

হিন হলো এমন এক ধরনের জ্বিন, যারা প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে। এরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা ছোট প্রকৃতির হয়। হাদিসে সরাসরি “হিন” শব্দটি নেই কিন্তু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাকার ও লোকবিশ্বাসে সাপ-কুকুর রূপের জিনদের একটি অংশকে “হিন” নামে অভিহিত করা হয়েছে। মধ্যযুগীয় মুসলিম সাহিত্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। 

নবী মুহাম্মদ ﷺ বলেছেন যে জিন ৩ প্রকার, একপ্রকার জ্বিনের ডানা আছে, তারা শূন্যে উড়ে বেড়ায়। দ্বিতীয় প্রকারের জ্বিন সাপ ও কুকুর (হিন) আকৃতি ধারণ করে। আর তৃতীয় প্রকারের জীন কোন এক নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে এবং ভ্রমণ করে। ।

(মিশকাত আল-মাসাবিহ ৪১৪৮)

২. ঘৌল

ঘৌল হলো এক ধরনের অত্যন্ত ধূর্ত ও আকৃতি পরিবর্তনকারী জ্বিন, যা সাধারণত কবরস্থান বা পরিত্যক্ত অন্ধকার স্থানগুলোতে থাকে। এরা অনেক সময় দানবীয় ভয়ংকর চেহারাসহ রূপ পরিবর্তন করে মনুষকে ভয় দেখায় ও বিভ্রান্ত করে। যেমন লম্বা দাঁত, শিং বা পশুর পা ইত্যাদি। 

ঘৌল জ্বিন সাধরণত শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের আক্রমণ করে। লোককাহিনিতে আছে, এরা মৃতদেহ উৎখনন করে মানুষের মাংস বা রক্ত খায়। ঘৌলকে আরবি লোককাহিনিতে "পিশাচ" হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। ফার্সি বইগুলিতে, ঘৌলকে গাধার পা এবং ছাগলের শিং বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। 

৩. জান

জ্বিনের প্রাচীন বা প্রথম প্রজন্ম হলো জান। তাদের মধ্য দিয়েই পরে “জিন” জাতির বংশ বিস্তার হয়। এরা শান্ত ও রূপ পরিবর্তনকারী। জানকে মরুভূমিতে বালুর ঘূর্ণি বা সাদা উটের রূপে দেখা যেতো।  তারা মরুদ্যান (পানির উৎস) লুকিয়ে রাখতে পারে, আবার কাউকে সাহায্য করতে সেটি উন্মুক্ত করতে পারে। এ ধরনের জ্বিন মানুষকে সরাসরি আক্রমণ করে না তাই তাদেরকে শান্ত ও তুলনামূলকভাবে বন্ধুসুলভ মনে করা হতো। 

বেদুইনরা ভাবত, বালির ছোট ঘূর্ণির ভেতর জান জ্বিন থাকে, মরুভূমিতে হঠাৎ একটি সাদা নিঃশব্দ উট দেখা গেলে সেটিকে জান বলে মনে করা হতো। তাদের ধারণা ছিল মানুষকে সাহায্যের জন্য জানরা ঘৌলের সাথে লড়াই করে, কারণ ঘৌল ভ্রমণকারীদের আক্রমণ করত।

৪. মারিদ

মারিদ অত্যন্ত বিদ্রোহী, বিশালদেহী জ্বিন। এরা জিনদের মধ্যে শক্তিশালী ও দৈত্যাকার। মন্ত্র, যাদু বা বিশেষ তাবিজ দিয়ে তাদের বাধ্য করা যায়। এরা সাগরের গভীরে, নদীর নির্জন অংশে, উপকূলের লুকানো গুহায় বাস করে। অন্যান্য জিনের তুলনায় মারিদদের দেখা পাওয়া খুবই বিরল। এ ধরনের জ্বিন দৈত্য, নীল আগুনের ধোঁয়া, মানুষ, জন্তু, অতিরিক্ত লম্বা ছায়া এসব রূপ ধারণ করতে পারে। 

মারিদ নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং অন্য জিনদের উপর আধিপত্য রাখতে চায়। তারা যাদুকরদের সাহায্যে কাজ করতে পারে এবং যাদুর মাধ্যমে মানুষকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।  এরা পানি, কুয়াশা, সমুদ্রের স্রোতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্যই তাদেরকে অনেক লোককাহিনিতে “ওয়াটার জিন” বলা হয়। 

وَحِفۡظࣰا مِّن كُلِّ شَیۡطَـٰنࣲ مَّارِدࣲ

“আর এটিকে (আকাশকে) রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী (মারিদ) শয়তান থেকে।

( সূরা:সফফাত - ৭ )

৫. ইফরিত

ইফরিত হলো জ্বিনের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিধর, অসাধারণ গতি, দুষ্ট এবং শয়তানজাত শ্রেণি। জাদুবিদ্যা, অলৌকিক ক্ষমতা, রূপ পরিবর্তনে এরা দক্ষ। এরা সাধারণত ধ্বংসাবশেষ, কবরস্থান, মরুভূমি, ভূগর্ভস্থ স্থান বা গুহায় বসবাস করে। 

قَالَ عِفۡرِیۡتٌ مِّنَ الۡجِنِّ اَنَا اٰتِیۡكَ بِهٖ قَبۡلَ اَنۡ تَقُوۡمَ مِنۡ مَّقَامِكَ ۚ وَ اِنِّیۡ عَلَیۡهِ لَقَوِیٌّ اَمِیۡنٌ ﴿۳۹﴾

"এক শক্তিশালী ইফরিত বলল:  ‘আপনি আপনার জায়গা থেকে উঠবার আগে আমি তা আপনার কাছে এনে দেব, এ কাজে আমি অবশ্যই ক্ষমতার অধিকারী ও আস্থাভাজন।" (সূরা নামল 27:39)

সুরা নামলের বর্ণনা অনুযায়ী, ইফরিদ নবী সুলায়মান (আ.) এর কাছে বহু দূর থেকে সিংহাসন এনে দিতে সক্ষম ছিল যা থেকে বুঝা যায় ইফরিত অতিমাত্রায় শক্তিশালী এবং দ্রুত কাজ করতে পারে।

৬. প্যালিস 

কুরআনে সরাসরি “প্রাসাদ জিন” শব্দ নেই। তবে সুলাইমান (আ.) জিনদের দিয়ে প্রাসাদ, বড় বড় স্থাপনা, দুর্গ ইত্যাদি নির্মাণ করিয়েছেন। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের লোককাহিনি ও ইসলামী সাহিত্য (যেমন আল-তাবারি, আল-কুরতুবি প্রমুখের ব্যাখ্যা) থেকে “প্রাসাদ নির্মাণে নিয়োজিত জিন” ধারণাটি জনপ্রিয় হয়েছে।

জানা যায়, প্যালিসের বুদ্ধিমত্তা কম , সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। এরা মরুভূমি বা নির্জন, খোলা অঞ্চলে বাস করে। ঘুমন্ত মানুষের আশেপাশে প্রায়শই উপস্থিত থাকে, বিশেষত যারা মরুভূমি বা একাকী স্থানে থাকে।

 یَعۡمَلُوۡنَ لَهٗ مَا یَشَآءُ مِنۡ مَّحَارِیۡبَ وَ تَمَاثِیۡلَ وَ جِفَانٍ كَالۡجَوَابِ وَ قُدُوۡرٍ رّٰسِیٰتٍ ؕ اِعۡمَلُوۡۤا اٰلَ دَاوٗدَ شُكۡرًا ؕ وَ قَلِیۡلٌ مِّنۡ عِبَادِیَ الشَّكُوۡرُ ﴿۱۳﴾

তারা তৈরী করত সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য প্রাসাদ, ভাস্কর্য, সুবিশাল হাউযের মত বড় পাত্র ও স্থির হাড়ি। ‘হে দাঊদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ’। (সূরা সাবা: ১৩)

বর্তমান ওমানের বাহলা দুর্গ এবং শহর এটি একসময় জিনদের শহর ছিল, এবং শহরের দুর্গটি তাদের দ্বারা নির্মিত বলে বিশ্বাস করা হয়।

৭. শয়তান

শয়তান বলতে এমন সকল বিদ্রোহী, অবাধ্য, মন্দপ্রবণ সত্তাকে বোঝানো হয় যারা আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে আছে এবং মানুষের হৃদয়ে কুমন্ত্রণা দেয়। 

শয়তানের মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের ঈমান দুর্বল করা, মানুষের অন্তরে সন্দেহ, ভয়, অহংকার, কামনা সৃষ্টি করা, মানুষকে পাপের প্রতি টেনে নেওয়া, আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ থেকে দূরে সরানো। শয়তানদের মাঝে সবচেয়ে বিশিষ্ট ও নেতা হলো ইবলিস। 

“এভাবে আমি মানুষের মধ্যে ও জিনের মধ্যে শয়তান সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আন'আম ৬:১১২)

শয়তান বলপ্রয়োগে মানুষকে পাপ করাতে পারে না। তার ক্ষমতা কেবল ওয়াসওয়াসা দেওয়া, মনে মন্দ পরামর্শ, লোভ, ভয়, ভুল সিদ্ধান্ত সৃষ্টি করা।

“তার কুমন্ত্রণা ছাড়া আমার তোমাদের ওপর কোনো ক্ষমতা ছিল না।” (সূরা ইব্রাহিম ১৪:২২)

Post a Comment

Previous Post Next Post